দু‘আ

রমযান অধ্যায়

১০টি দু‘আ
১

নতুন চাঁদ দেখে পড়ার দু‘আ-১

۞ اَللّٰهُمَّ اَهِلَّهٗ عَلَيْنَا بِالْاَمْنِ وَالْاِيْمَانِ وَالسَّلَامَةِ وَالْاِسْلَامِ رَبِّيْ وَرَبُّكَ اللّٰهُ
উচ্চারণ

আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু ‘আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ইমানি, ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলামি, রাব্বী ওয়া রব্বুকাল্লাহ।

অর্থ

হে আল্লাহ, এই চাঁদকে আমাদের উপর বরকত, ইমান, শান্তি ও ইসলামের সহিত উদিত করুন, হে চাঁদ, আমার ও তোমার রব আল্লাহ তা’আলা।

ফযীলত

মুহাম্মদ ইবনে বাশশার (রহ) হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রাযি) থেকে বর্ণনা করেন, নবী কারীম (ﷺ) যখন নতুন চাঁদ দেখিতেন তখন এই দু‘আ পড়তেন।

তথ্যসূত্র: সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৪৫১; মুসতাদরাকে হাকিম, ৪: ২৮৫

২

নতুন চাঁদ দেখে পড়ার দু‘আ-২

۞ اَللّٰهُ أَكْبَرْ، اَللّٰهُمَّ أَهِلَّهٗ عَلَيْنَا بِالْأَمْنِ وَالْإِيْمَانِ، وَالسَّلاَمَةِ وَالْإِسْلاَمِ، وَالتَّوْفِيْقِ لِمَا تُحِبُّ رَبَّنَا وَتَرْضٰى، رَبُّنَا وَرَبُّكَ اللّٰهُ
উচ্চারণ

আল্লা-হু আকবার, আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু ‘আলাইনা বিলআমনি ওয়ালঈমানি ওয়াস্‌সালা-মাতি ওয়াল-ইসলা-মি, ওয়াত্তাওফীকি লিমা তুহিব্বু রব্বানা ওয়া তারদ্বা, রব্বুনা ওয়া রব্বুকাল্লাহ।

অর্থ

হে আল্লাহ! আপনি এই নতুন চাঁদকে আমাদের উপর উদিত করুন নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে; আর হে আমাদের রব্ব! যা আপনি পছন্দ করেন এবং যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন তার প্রতি তাওফীক লাভের সাথে। আল্লাহ আমাদের রব্ব এবং তোমার (চাঁদের) রব্ব।

ফযীলত

হযরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রাযি) বর্ণনা করেন, নবী কারীম (ﷺ) যখন নতুন চাঁদ দেখতেন তখন এই দু‘আ পড়তেন।

তথ্যসূত্র: সুনানে দারেমী, হাদীস নং: ১৬২৫; ফিকহুস সুনান, হাদীস নং: ১২৭৫;
মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ১৩৯৭

৩

রজব ও শা‘বান মাসের দু‘আ

۞ اَللّٰهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيْ رَجَبَ وَشَعْبَانَ وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ
উচ্চারণ

আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রজাবা ওয়া শা‘বানা ওয়া বাল্লিগনা রমাযানা।

অর্থ

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে রজব ও শা’বান মাসের বরকত দান করুন ও আমাদেরকে রামাযান মাসে পৌঁছে দিন।

ফযীলত

হযরত আনাস (রাযি) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রজব মাস আসলে এ দু‘আ পড়তেন।

তথ্যসূত্র: আত-তাবারানী, হাদীস নং: ৩৯৩৯; বাইহাকী, হাদীস নং: ৩৮১৫

৪

রমযান মাসে পড়ার দু‘আ

۞ اَللّٰهُمَّ اِنَّا نَسْئَلُكَ الْجَنَّةَ وَنَعُوْذُبِكَ مِنَ النَّارِ
উচ্চারণ

আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া না‘ঊযুবিকা মিনান নারি।

অর্থ

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে জান্নাত দান করেন এবং জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেন।

ফযীলত

আবূ সালিহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জনৈক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন,
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক ব্যক্তিকে বললেন, তুমি সালাতে কি পড়? সে তদুত্তরে বলল, আমি তাশাহহুদ পাঠ করি, তারপর এই দু‘আ পড়ি।

তথ্যসূত্র: আল মুসনাদ (ফাতহুর রাব্বানী), হাদীস নং: ৭৪৫

৫

সাহরী খাওয়া

সাহরীর গুরুত্ব:
রোযার নিয়তে সুবহে সাদিকের পূর্বে যে খাবার গ্রহণ করা হয় তা হল সাহরী। সাহরী খাওয়া সুন্নত। সাহরীতে পেট ভরে খাওয়া আবশ্যক নয়; এক দুই ঢোক পানি পান করেও এ সুন্নত আদায় করা যায়।
শেষ ওয়াক্তে সাহরী গ্রহণ করা উত্তম:
সাহরী করা যেমন মুস্তাহাব তেমনি তা ওয়াক্তের শেষ দিকে করাও উত্তম। অর্থাৎ সতর্কতামূলক সময় হাতে রেখে সুবহে সাদিকের পূর্ব-নিকটবর্তী সময়ে সাহরী করা ভালো। নবীজী (ﷺ) বলেন, আমরা নবীগণ এ মর্মে আদিষ্ট হয়েছি যে, সময় হওয়ার সাথে সাথেই ইফতার করব এবং শেষ ওয়াক্তে সাহরী গ্রহণ করব। (আল-মুজামুল আওসাত, তবারানী, হাদীস নং: ১৮৮৪; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস নং: ৪৮৮০)

সাহাবায়ে কেরামের আমলও এরকম ছিল। হযরত আমর ইবনে মাইমুন আলআউদী রাহ. বলেন
সাহাবায়ে কেরাম সময় হওয়ার সাথে সাথেই দ্রুত ইফতার করতেন আর শেষ ওয়াক্তে সাহরী করতেন। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ৭৫৯১; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৮৯৩২)

সাহরীতে রয়েছে বরকত কিন্তু তা গ্রহণ করা ওয়াজিব নয়। কেননা নবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীগণ একটানা রোযা পালন করেছেন অথচ সেখানে সাহরির কোন উল্লেখ নেই।
সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ১৯২৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০৯৫
ফযীলত

১. সাহরীতে রয়েছে বরকত:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন, তোমরা সাহরী কর। কেননা সাহরীর খাবারে বরকত রয়েছে।
অতএব সাহরীর খাবার রোযা রাখতে শক্তি যোগায়। তেমনি এতে খায়র ও বরকত এবং পুণ্য ও কল্যাণও নিহিত রয়েছে।

২. যারা সাহরী গ্রহণ করে তাদের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়:
আরেক হাদীসে এসেছে
সাহরী খাওয়াতে বরকত রয়েছে। অতএব তোমরা তা পরিত্যাগ করো না; এক ঢোক পানি পান করে হলেও সাহরী গ্রহণ কর। কেননা যারা সাহরী খায় আল্লাহ তাদের উপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ তাদের জন্য রহমতের দু‘আ করতে থাকে।

তথ্যসূত্র: ১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ১৯২৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০৯৫
২. মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং: ৯০১০; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং: ৩৪৭৬; কানযুল উম্মাল, হাদীস নং: ২৩৯৭৮

৬

ইফতারের সময় পড়বে-১

۞ يَا وَاسِعَ الْمَغْفِرَةِ اِغْفِرْ لِيْ
উচ্চারণ

ইয়া ওয়াসিয়াল মাগফিরাতি ইগফির্‌লী।

অর্থ

হে মহান ক্ষমাকারী! আমাকে ক্ষমা করুন।

শুআ’বুল ঈমান, বাইহাকী, হাদীস নং: ৩৬২০
৭

ইফতারের সময় পড়বে-২

۞ اَللّٰهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلٰى رِزْقِكَ اَفْطَرْتُ
উচ্চারণ

আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফত্বারতু।

অর্থ

হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্যেই রোযা রেখেছি এবং আপনার রিযিক দ্বারা ইফতার করছি।

ফযীলত

হযরত মু‘আয ইবনে যুহরা (রাযি) নবী কারীম (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ইফতারের সময় এই দু‘আ পড়তেন। (সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং: ২৩৫৮; আল-ফাতহুর রাব্বানি, ৪: ৩৩৯)
হাদিসের ব্যাখ্যাঃ ইফতারের সময় হওয়ার পর দ্রুত ইফতার করা ছিল নবীগণের বৈশিষ্ট্য। সাহাবায়ে কেরামও দ্রুত ইফতার করতেন। নবী কারীম (ﷺ) বলেন,
মানুষ ততদিন খায়র ও কল্যাণের মাঝে থাকবে যতদিন তারা সময় হওয়ার সাথে সাথে দ্রুত ইফতার করবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ১৯৫৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০৯৮)
অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়,
ততদিন দ্বীন প্রতিষ্ঠিত থাকবে যতদিন মানুষ দ্রুত ইফতার করবে। কেননা ইহুদী-নাসারারা এক্ষেত্রে বিলম্ব করে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং: ৮৯৪৪)

হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
সময় হওয়ার সাথে সাথে দ্রুত ইফতারকারী আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৭০০; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ৭২৪১, ৮৩৬০)

একবার হযরত মাসরূক রাহ. হযরত আয়িশা (রাযি)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে উম্মুল মু'মিনীন! মুহাম্মাদ (ﷺ) এর সাহাবীদের দুই ব্যক্তির মধ্যে এক ব্যক্তি ইফতার ও নামাযে ত্বরান্বিত করে এবং অন্য এক ব্যক্তি ইফতার ও নামায বিলম্ব করে। আম্মাজান জিজ্ঞাসা করলেন, তবে দ্রুত করেন কে? বললেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি)। হযরত আয়িশা (রাযি) বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও এমনটিই করতেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০৯৯; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৭০২)

৮

ইফতারের পর এ দু‘আ পড়বে

۞ ذَهَبَ الظَّمَأُ. وَابْتَلَّتِ الْعُرُوْقُ. وَثَبَتَ الْاَجْرُ اِنْ شَاءَ اللهُ
উচ্চারণ

জাহাবায যমাউ ওয়াব তাল্লাতিল ‘উরূক্বু ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।

অর্থ

পিপাসা দূরীভূত হয়েছে, ধমনী সমূহ সতেজ হয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ (রোযার সওয়াব) নিশ্চিত হয়েছে।

খেজুর দিয়ে ইফতার করা
নবীজী (ﷺ) খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তাই খেজুর দিয়ে ইফতার করা মুস্তাহাব। খেজুর না পেলে পানি দিয়ে। নবীজী (ﷺ) বলেন, তোমাদের কেউ ইফতার করলে সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। খেজুর না থাকলে পানি দিয়ে। কেননা তা পবিত্র বস্তু। সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৬৯৫
ফযীলত

হযরত ইবনে সালিম আল্-মুকাফফা (রহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনে উমর (রাযি)-কে এক মুষ্টির অধিক দাঁড়ি কর্তন করতে দেখেছি। এরপর তিনি বলেন, নবী কারীম (ﷺ) ইফতারের সময় উক্ত দু‘আ পড়তেন।
নামাযের আগেই ইফতার করা। সূর্য অস্তমিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোযাদার ইফতার করবে এবং মুয়াজ্জিন আযান দিবে।
ইফতারের ওয়াক্ত আযান শুরু হওয়ার পর হয় বিষয়টি এমন নয়।
আমাদের দেশে রেওয়াজ আছে, লোকেরা ইফতার সামনে নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে এবং আযানের শব্দ শোনার আগ পর্যন্ত ইফতার করে না। এ থেকে কারো কারো মনে এ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, ইফতারের ওয়াক্তই শুরু হয় আযানের পর। এই ধারণা ঠিক নয়। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই ইফতারের ওয়াক্ত হয়। আর বিনা কারণে ইফতার বিলম্ব করা খেলাফে সুন্নত। ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা উচিত।
নামাযের পূর্বেই সংক্ষিপ্তভাবে ইফতার সেরে নেওয়া; ইফতারের জন্য বিশাল আয়োজন লাগবে এমনটি নয়। নবীজীর আমলও এমনই ছিল। হযরত আনাস (রাযি) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাগরিবের নামায পড়ার পূর্বেই তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করে নিতেন। তাজা খেজুর না থাকলে শুকনো খেজুর দিয়ে। আর তাও না থাকলে কয়েক ঢোক পানি পান করে নিতেন।

তথ্যসূত্র: সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং: ২৩৫৭
সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং: ২৩৫৬; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৬৯৬; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং: ৯৭৮৯

৯

অন্যের বাড়ীতে ইফতার করলে এ দু‘আ পাঠ করবে

۞ اَفْطَرَ عِنْدَكُمُ الصَّائِمُوْنَ وَاَكَلَ طَعَامَكُمُ الْاَ بْرَارُ وَصَلَّتْ عَلَيْكُمُ الْمَلَائِكَةُ
উচ্চারণ

আফত্বরা ‘ইনদাকুমুস সা-ইমূন ওয়া আকালা ত্ব‘আমাকুমুল আবরার, ওয়া সল্লাত ‘আলাইকুমুল মালাইকাতু।

অর্থ

রোযাদারগণ যেন তোমাদের বাড়ীতে ইফতার করে এবং নেক লোকেরা যেন তোমাদের খানা খায় এবং ফেরেশতাগণ যেন তোমাদের উপর রহমতের দু‘আ করে।

সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং: ৩৮৫৪; সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং: ১০১২৯, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ, হাদীস নং: ২৯৯
১০

শবে ক্বদরে পড়ার দু‘আ

اَللّٰهُمَّ اِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيْ ۞
উচ্চারণ

আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউয়ুন তুহিব্বুল ‘আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নী।

অর্থ

হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি অতি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে পছন্দ করেন। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।

ফযীলত

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে হযরত আয়িশা (রাযি) রমাদানের শেষ দশদিনের দু‘আ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উপরোক্ত দু‘আটির কথা বলেছিলেন।

তথ্যসূত্র: সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস নং: ৩৮৫০