কুরআনে বর্ণিত ‘রাব্বানা’ ও ‘রাব্বি’ দুআ বলতে কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক বিভিন্ন নবী-রাসূল, নেককার মুমিন ও ফেরেশতাদের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে শিক্ষা দেওয়া বা তাদের মুখে বর্ণিত দুআসমূহকে বোঝায়। এসব দুআর অধিকাংশই ‘রাব্বানা’ (হে আমাদের রব!) বা ‘রাব্বি’ (হে আমার রব!) শব্দ দিয়ে শুরু হয়েছে। তাই এগুলো ‘রাব্বানা/রাব্বি দুআ’ নামে পরিচিত।
শাহর ইবনে হাওশাব (রহ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, উম্মু সালামাহ (রাযি) কে আমি বললাম, হে উম্মুল মু’মিনীন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপনার কাছে অবস্থানকালে অধিকাংশ সময় কোন দু‘আটি পাঠ করতেন? তিনি বললেন, তিনি অধিকাংশ সময় এ দু‘আ পাঠ করতেন।
হযরত উম্মু সালামাহ (রাযি) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অধিকাংশ সময় দু‘আটি কেন পাঠ করেন? তিনি বললেনঃ হে উম্মু সালামাহ! এরূপ কোন মানুষ নেই যার মন আল্লাহ তা‘আলার দুই আঙ্গুলের মধ্যবর্তীতে অবস্থিত নয়। যাকে ইচ্ছা তিনি (দ্বীনের উপর) স্থির রাখেন এবং যাকে ইচ্ছা (দ্বীন হতে) বিপথগামী করে দেন। তারপর কুরআনের উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে আপনার একান্ত অনুগত বানিয়ে নিন এবং আমাদের বংশধরদের মধ্যেও এমন উম্মত সৃষ্টি করুন, যারা আপনার একান্ত অনুগত হবে এবং আমাদেরকে আমাদের ইবাদতের পদ্ধতি শিক্ষা দিন এবং আমাদের তওবা কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি এবং কেবল আপনিই ক্ষমাপ্রবণ (এবং) অতিশয় দয়ার মালিক।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দ্বারা যদি কোনও ভুল-ত্রুটি হয়ে যায় তবে সেজন্য তুমি আমাদের পাকড়াও করো না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের প্রতি সেই রকমের দায়িত্বভার অর্পণ করো না, যেমন তা অর্পণ করেছিলে আমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর এমন ভার চাপিয়ো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের (ত্রুটিসমূহ) মার্জনা কর, আমাদের ক্ষমা কর এবং আমাদের প্রতি দয়া কর। তুমিই আমাদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য কর।
হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি যা-কিছু নাযিল করেছেন আমরা তাতে ঈমান এনেছি এবং আমরা রাসূলের অনুসরণ করেছি। সুতরাং আমাদেরকে সেই সকল লোকের মধ্যে লিখে নিন, যারা (সত্যের) সাক্ষ্যদাতা।
সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং : ৫৩
ফযীলত
নবী করীম ﷺ ফজরের দুই রাকাত সুন্নত নামাযে এই আয়াত তিলাওয়াত করেছেন।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের গুনাহসমূহ এবং আমাদের দ্বারা আমাদের কার্যাবলীতে যে সীমালংঘন ঘটে গেছে তা ক্ষমা করে দিন। আমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে বিজয় দান করুন।
হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। আপনি (এমন ফজুল কাজ থেকে) পবিত্র। সুতরাং আপনি আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।
হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি যাকেই জাহান্নামে দাখিল করবেন, তাকে নিশ্চিতভাবেই লাঞ্ছিত করলেন। আর জালিমগণ তো কোনও সাহায্যকারী পাবে না।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা এক ঘোষককে ঈমানের দিকে ডাক দিতে শুনেছি যে, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আন।’ সুতরাং আমরা ঈমান এনেছি। কাজেই হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন, আমাদের মন্দসমূহ আমাদের থেকে মিটিয়ে দিন এবং আমাদেরকে পুণ্যবানদের মধ্যে শামিল করে নিজের কাছে তুলে নিন।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে সেই সবকিছু দান করুন, যার প্রতিশ্রুতি আপনি নিজ রাসূলগণের মাধ্যমে আমাদেরকে দিয়েছেন। আমাদেরকে কিয়ামতের দিন লাঞ্ছিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি কখনও প্রতিশ্রুতির বিপরীত করেন না।
হে আল্লাহ! আমাদের পালনকর্তা আমাদের প্রতি আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করুন। তা আমাদের জন্যে অর্থাৎ, আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার জন্যে আনন্দোৎসব হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আপনি আমাদের রুযী দিন। আপনিই শ্রেষ্ট রুযীদাতা।
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাকে জ্ঞান দান করুন। এবং সৎকর্মপরায়ণদের মধ্যে শামিল কর। এবং পরবর্তীকালীন লোকদের মধ্যে আমার পক্ষে এমন রসনা সৃষ্টি করুন, যা আমার সততার সাক্ষ্য দেবে। এবং আমাকে সুখময় জান্নাতের অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
হে আমাদের রব! তুমি আমাদেরকে এমন স্ত্রী-সন্তান দান কর যাদের দর্শনে আমাদের চক্ষুশীতল হয়ে যাবে। তুমি আমাদেরকে পরহেযগার লোকদের ইমাম (অভিভাবক) বানিয়ে দাও।
সূরা আল-ফুরকান আয়াত নং: ৭৪
ফযীলত
যারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে যে, তিনি যেন তাদের সন্তান-সন্ততির মধ্য থেকে এমন লোক সৃষ্টি করেন, যারা তাঁর আনুগত্য করবে এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে—তাঁর কোনো শরিক নেই।
ইবনু আব্বাস রাযি. বলেন: এর দ্বারা তারা এমন সন্তান কামনা করে, যারা নেক আমল করবে। ফলে দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের দেখে তাদের চোখ জুড়িয়ে যাবে।
ইকরিমা রহ. বলেন: তারা এর দ্বারা সন্তানদের সৌন্দর্য বা রূপ-লাবণ্য কামনা করেননি; বরং তারা চেয়েছেন, তাদের সন্তানরা যেন আল্লাহর অনুগত হয়।
হাসান বসরী রহ.-কে যখন এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন: এর অর্থ হলো—আল্লাহ যেন কোনো মুসলিম বান্দাকে তার স্ত্রী, ভাই এবং নিকটজনদের মধ্যে আল্লাহর আনুগত্য দেখতে দেন। আল্লাহর কসম! কোনো মুসলিমের চোখের জন্য এর চেয়ে অধিক প্রশান্তিদায়ক আর কিছু নেই যে, সে তার সন্তান, নাতি-নাতনি, ভাই অথবা কোনো প্রিয়জনকে আল্লাহর অনুগত অবস্থায় দেখতে পায়।”
হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের ওপর সবরের গুণ ঢেলে দাও, আমাদেরকে দৃঢ় ও অবিচল রাখো এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য ও বিজয় দান কর।
সূরা বাকারাহ, আয়াত নং: ২৫০
ফযীলত
হযরত মূসা (আ)-এর ইন্তেকালের পর অত্যাচারী কাফির শাসক জালুত বনী ইসরাঈলদের ওপর আক্রমণ করে তাদের জনপদ দখল করে নেয় এবং সন্তানদের বন্দী করে। পরবর্তীতে বনী ইসরাঈলদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তালুতকে তাদের রাজা বা সেনাপতি মনোনীত করেন।
তালুত যখন জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্য নিয়ে রওনা হন, তখন প্রচণ্ড গরমে পথিমধ্যে একটি নদীর পানি দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাদের ঈমান ও ধৈর্যের পরীক্ষা নেন। তৃষ্ণার্ত সৈন্যদের নদী থেকে সামান্য পানি ছাড়া অতিরিক্ত পানি পান করতে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু অল্প কয়েকজন ব্যতীত প্রায় সব সৈন্যই অতিরিক্ত পানি পান করে পরীক্ষায় ব্যর্থ হয় এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ও অলস হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত মাত্র কয়েকজন খাঁটি মুমিন সৈন্য নদী পার হয়ে জালুতের বিশাল ও শক্তিশালী বাহিনীর মুখোমুখি হন। শত্রুর বিশালতার সামনে ভয় না পেয়ে তারা বিশ্বাস করেছিলেন যে আসল শক্তি সৈন্যসংখ্যায় নয়, বরং আল্লাহর সাহায্যে নিহিত। সেই চরম প্রতিকূল মুহূর্তে তারা আল্লাহর দরবারে ধৈর্য ও বিজয়ের প্রার্থনা (দুআ) করেন। যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে এই প্রার্থনাটি করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে ধৈর্য ও অবিচলতা লাভ করা যায় এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।
হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সাথে এবং আমাকে নিষ্ক্রান্ত বাহির করাও কল্যাণের সাথে এবং তোমার নিকট হতে আমাকে দান করো সাহায্যকারী শক্তি।
সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত নং: ৮০
ফযীলত
এ দু‘আ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শেখানো হয়েছে, যেন তিনি আরজ করছেন, হিজরত করে আমার মদীনায় গমন যেন হয় বরকতের কারণ। হিজরত করে মক্কা ত্যাগও হয় সৌভাগ্যের সূচনা। ‘সিদক’ তথা ইখলাস ও কামিয়াবি যেন হয় আমার সঙ্গী। আর আপন খাস রহমত ও নুসরত দ্বারা সর্বাবস্থায় আমাকে অবিচল রাখুন।
হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের উভয়ের (পিতা-মাতার) প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।
সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত নং: ২৩-২৪
ফযীলত
আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং তাকে ইবাদত করার পর পিতা মাতার সাথে উত্তম ব্যবহারের আদেশ দিয়েছেন। তাদের সাথে ’উহ’ শব্দটিও উচ্চারন করতে কুরআন মাজীদে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। হাদীসে এসেছে, মৃত্যুর পর মা-বাবার জন্য নেক সন্তান দু‘আ করলে আল্লাহ কবুল করেন।
বি:দ্র: এই দু‘আটি জীবিত মৃত সকলের জন্য পড়া যায়। সকলের উচিত মা-বাবার জন্য প্রতিনিয়ত এ দু‘আ পড়া।
হে আমার পালনকর্তা, আমাকে এরূপ ভাগ্য দান কর, যাতে আমি তোমার নেয়ামতের শোকর করি, যা তুমি দান করেছ আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে এবং যাতে আমি তোমার পছন্দনীয় সৎকাজ করি। আমার জন্য আমার সন্তানদের সৎকর্মপরায়ণ করে দিন; আমি অবশ্যই আপনার নিকট তওবা করছি এবং নিশ্চয়ই আমি অনুগত বান্দাদের একজন।
হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে কাফেরদের পরীক্ষার পাত্র বানাবেন না এবং হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই কেবল আপনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
হে আমাদের প্রতিপালক! ক্ষমা কর আমাদেরকে এবং আমাদের সেই ভাইদেরকেও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে এবং আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের প্রতি কোন হিংসা-বিদ্বেষ রেখ না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি অতি মমতাবান, পরম দয়ালু।
সূরা হাশর, আয়াত: ১০
ফযীলত
ঈমানের মাপকাঠি: সাহাবীদের প্রতি অন্তরে ভালোবাসা রাখা এবং তাঁদের জন্য এই মাগফিরাতের দু‘আ করা পরবর্তী মুসলমানদের ঈমান ও সত্যপন্থী হওয়ার প্রধান শর্ত।
রাষ্ট্রীয় সম্পদে (ফায়) অংশীদারিত্ব: যারা সাহাবীদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এই দু‘আ করবে, ফায়-এর মালে (রাষ্ট্রীয় সম্পদ) কেবল তাদেরই অধিকার থাকবে।
জান্নাতী আলামত: এই দু‘আর মাধ্যমে অন্তরকে মুসলমানদের প্রতি পারস্পরিক হিংসা, বিদ্বেষ ও কুধারণা থেকে মুক্ত রাখা যায়, যা মানুষকে জান্নাতী হওয়ার উচ্চ মর্যাদায় আসীন করে।